
সম্প্রতি আমি ব্যোমকেশ বক্সীর বেশ কিছু সিরিজ দেখছিলাম। তবে অদ্ভুত বিষয় হলো, গোয়েন্দা কাহিনীর রহস্যের চেয়েও আমাকে বেশি টালমাটাল করে দিচ্ছিল সিরিজের দৃশ্যগুলো। প্রতিটা ফ্রেম যেন একেকটা জীবন্ত ক্যানভাস! সেই রাজকীয় খাট, ড্রয়িং রুমের কোণায় সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামোফোন, দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর ধুতি-পাঞ্জাবিতে বাঙালির সেই পরিশীলিত আভিজাত্য—সব মিলিয়ে এমন এক সৌন্দর্য, যা চোখের জন্য ভীষণ আরামদায়ক।
কিন্তু এই সিরিজগুলো দেখতে দেখতে নিজের ভেতরে একটা শূন্যতা অনুভব করলাম। বারবার মনে হচ্ছিল, আমাদের এই সংস্কৃতিটা কেন বদলে গেল? কেন আজকের এই আধুনিক বা ধনী পরিবারগুলোতেও সেই রুচি আর দেখা যায় না?
01. কেন হারিয়ে গেল সেই আভিজাত্য?
আমার মনে হয়, এই আভিজাত্য হারানোর প্রধান কারণ হলো আমাদের অতিরিক্ত জনসংখ্যা। এই বিশাল জনসংখ্যার ভিড়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে আমাদের পুরো দিনটা এখন ব্যস্ততায় কাটে। আগেকার সেই জমিদারী বা বনেদি ঘরানায় আভিজাত্য বজায় রাখার জন্য যে বিপুল পরিমাণ সম্পদের প্রয়োজন ছিল, তা এখনকার সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে। সামর্থ্য থাকলেও জায়গার অভাবে সেই বিশাল বিশাল আসবাব বা বাড়ির স্থাপত্য ফুটিয়ে তোলা এখন প্রায় অসম্ভব।
02. মানসিকতার পরিবর্তন: আসল লড়াই
আলোচনাটা যখন আরও গভীরে নিয়ে গেলাম, তখন বুঝলাম শুধু সম্পদ বা জায়গা নয়, মূল অভাবটা হলো মানসিকতার। আমরা যদি আজ কোটি টাকা খরচ করে সেই রাজকীয় খাট বা গ্রামোফোন ফিরিয়েও আনি, সেই "সময়" আর "মানুষের মানসিকতা" কি ফিরে আসবে? উত্তর হলো—না।
"তখনকার মানুষের মনে এক ধরণের স্থিরতা ছিল। একটা চিঠির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করার ধৈর্য ছিল।"
আর আজকের যুগে আমাদের সত্য-মিথ্যা পাল্টাতে এক বেলাও সময় লাগে না। সকালে যা সত্য বলে প্রচার করি, বিকেলে তা ডাস্টবিনে ফেলি। এমন দ্রুত পরিবর্তনশীল মানসিকতায় পুরনো দিনের সেই ধীরস্থির আভিজাত্য প্রতিস্থাপন করলেও তা কয়েক মুহূর্তের বেশি টিকবে না।
03. গতিশীলতা বনাম স্থবিরতা
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এক সময়ের অতি ধীরতা যেমন মানুষের জীবনকে স্থবির ও অসাড় করে তুলত, এখনকার অতি গতিশীলতাও ঠিক তাই করছে। প্রযুক্তির উন্নতির একটা পর্যায়ে গিয়ে কি আমরা স্থির হতে পারব? সম্ভবত না। পরিবর্তনের এই গতি ভবিষ্যতে আরও দ্রুত হবে।
আগে মানুষ অলসতার কারণে অসাড় হয়ে যেত, আর এখন আমরা গতির চোটে অসাড় হয়ে গেছি। আমরা ব্যস্ত, কিন্তু আমাদের ভেতরটা কাজ করছে না। আমরা শুধু সময়ের রুটিন মেনে চলা একেকটা যন্ত্র হয়ে উঠছি। এই ভিড়ের খেলায় আমরা এতটাই বুঁদ যে নিজের অস্তিত্ব অনুভব করার মতো নিস্তব্ধতাটুকুও আমাদের নেই।
শেষ কথা
সময়ের স্রোতে যা ঘটে তা সম্ভবত একবারই ঘটে। ভিন্ন কিছু হয়তো আসে, সেটা হয়তো প্রযুক্তির বিচারে পুরনোটার চেয়ে ভালো, কিন্তু পুরনো সেই আমেজ আর ফিরে আসে না।
আমি এখনো ব্যক্তিগতভাবে সেই নিরব নিস্তব্ধতা আর বাঁধানো পুকুরঘাট প্রত্যাশা করি। চারপাশে এতো মানুষের কোলাহলের মাঝে নিজেকে অনুভব করতে চাওয়াটাই যেন এখনকার সবচেয়ে বড় বিলাসিতা। আমাদের কি এই যান্ত্রিক জীবনের সাথে মানিয়ে নিয়েই এই নস্টালজিয়া আঁকড়ে থাকতে হবে? নাকি আমরা নিজেদের জন্য ছোট কোনো 'শান্তির দ্বীপ' তৈরি করতে পারব?