
আমরা যখন আয়নার সামনে দাঁড়াই, তখন যাকে দেখি তাকে খুব পরিচিত মনে হয়। আমরা মনে করি, এই আমি মানুষটা সবসময় এমনই ছিলাম, হয়তো আমৃত্যু এমনই থাকব। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, আমি কোনো স্থির পাথর বা বিন্দু নয়; বরং আমি হলো প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া অসংখ্য ক্রিয়া, অনুভূতি ও জানার সমষ্টি।
আজ আমার এই দর্শনের পেছনের যুক্তিগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।
১. আমিত্ত্ব যখন একটি গাণিতিক ফাংশন
গণিতের ভাষায় বলতে গেলে, আমি হলাম একটি জটিল ফাংশন (Complex Function)। যেখানে:
            f(x) = y
এখানে, x হলো ইনপুট—অর্থাৎ আমার চারপাশের পরিবেশ, পরিস্থিতি, বেড়ে ওঠা এবং অভিজ্ঞতা। আর y হলো আউটপুট—অর্থাৎ আজকের এই আমি বা আমার আচরণ। আমার জীবনের গত ২২ বছরে এই ফাংশনে কোটি কোটি ইনপুট যোগ হয়েছে। যার ফলে একেক সময় আমি একেক রকম আউটপুট দিয়েছি। আজ থেকে ৫ বছর আগে কোনো একটা পরিস্থিতিতে আমি যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতাম, আজ হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে জানাই। কারণ আমার ভেতরের 'ফাংশন'টি প্রতিনিয়ত আপডেট হচ্ছে।
২. স্মৃতিহীনতা ও অস্তিত্বের সংকট
আমি যদি আমার ২২ বছরের জীবনের কোনো কিছুই মনে করতে না পারি, তবে কি আজকের এই আমি'র কোনো অস্তিত্ব থাকবে? অবশ্যই না। শরীরের কাঠামো একই থাকলেও, ব্যক্তিত্ব হিসেবে আমি হব সম্পূর্ণ নতুন কেউ।
"আমি বা আমিত্ত্ব হলো কিছু ঘটমান ক্রিয়া। স্মৃতি ছাড়া আমিত্ত্বের কোনো অস্তিত্ব আছে কি?"
আমাদের শৈশবের ৪-৫ বছর বয়স পর্যন্ত কোনো স্মৃতি আমাদের মনে থাকে না। যদি আমি কোনো স্থায়ী বা ধ্রুবক হতো, তবে জন্মের মুহূর্ত থেকেই তো আমার অস্তিত্বের প্রমাণ থাকার কথা ছিল। কিন্তু আসলে আমি হলো কিছু ঘটনার পরম্পরা। স্মৃতি যেখানে শুরু, আমাদের চেনা আমিত্ত্বের শুরুও সেখানে।
৩. জীবনের বিভিন্ন পর্যায় এবং অচেনা আমি
আমি আমার ২২ বছর জীবনকে ৪–৫টি ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রতিটি ভাগে আমি ছিলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। চিন্তা, স্বপ্ন, ভয়, আত্মবিশ্বাস—সবকিছুই প্রতিটি পর্যায়ে আলাদা ছিল। এই প্রতিটি ভাগের পেছনে ছিল ভিন্ন ভিন্ন প্রভাবক ও পরিস্থিতি, যা আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন করে গড়ে তুলেছে।
আজকের এই আমি যদি পাঁচ বছর আগের সেই আমার সঙ্গে দেখা করি, হয়তো আমরা একে অপরকে চিনতেই পারব না। একই শরীর হলেও মানসিকতার ফারাক হবে আকাশ-পাতাল। সময় শুধু বয়স বাড়ায় না, আমাদের ভেতরের মানুষটাকেও নতুন করে তৈরি করে। তাই প্রতিটি পর্যায়ে আমি ছিলাম একেকটি “অচেনা আমি”।
৪. সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বনাম বাস্তবতা
আমাদের চারপাশের মানুষ আমাদের সবসময় একটি স্থির বা ধ্রুবক (Constant) হিসেবে দেখতে চায়। সমাজ আসলে মানুষের ভেতরের এই জটিল পরিবর্তনশীল ফাংশনটিকে বুঝতে চায় না। তারা কেবল একটা নির্দিষ্ট সময়ের 'আউটপুট' দেখে আমাদের বিচার করে।
সমাজ আমাদের একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের ভেতরে আটকে রাখতে চায়—আমার নাম কী, আমি কেমন স্বভাবের, আমার পরিবার বা বংশ কী, আমার মর্যাদা কতটুকু। একবার লেবেল লাগিয়ে দিলে তারা ধরে নেয়, মানুষ আর বদলায় না। কিন্তু বাস্তবে মানুষ প্রতিদিন নতুন অভিজ্ঞতায় নিজেকে আপডেট করে।
৫. সিদ্ধান্তের শেকড়ে নতুন আমি
আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় আসে সিদ্ধান্ত থেকে। একটা ছোট সিদ্ধান্ত—কোন বন্ধু বেছে নিলাম, কোন বই পড়লাম, কোন ভয়কে অগ্রাহ্য করলাম—সেটাই ভবিষ্যতের আমাকে তৈরি করে। প্রতিটি সিদ্ধান্ত আসলে আমাদের ফাংশনের ভেতরে নতুন ইনপুট যোগ করে। আজকের আমি, গতকালের সিদ্ধান্তের ফল। তাই আমরা যতবার সিদ্ধান্ত নিই, ততবারই একটু একটু করে নতুন মানুষ হয়ে উঠি।
উপসংহার
আমি বিশ্বাস করি, আমরা কেউই স্থির কোনো গন্তব্য নই, বরং আমরা একেকটি চলমান যাত্রা। নদী যেমন স্থির কোনো পানি নয়, বয়ে চলা পানির একটি প্রবাহ—মানুষের অস্তিত্বও ঠিক তেমনি অসংখ্য শারীরিক ও মানসিক ক্রিয়ার একটি ধারা। আমরা প্রতিনিয়ত শিখছি, জানছি এবং আমাদের ভেতরের 'কোড' পরিবর্তন করছি।
আমরা আসলে আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি হওয়া একেকটা সংস্করণ মাত্র।