বাংলাদেশে সন্তান হয়ে বড় হওয়া মানে শুধু বয়স বাড়ানো নয়, বরং অদৃশ্য কিছু দায় ও প্রত্যাশার বোঝা কাঁধে নিয়ে চলা। বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আড়ালে এমন কিছু সামাজিক ও মানসিক চাপ লুকিয়ে থাকে, যা অনেক সময় সন্তানের নিজস্ব অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও স্বপ্নকে দমিয়ে রাখে। এই লেখায় আমরা বাংলাদেশের পারিবারিক কাঠামোর সেই অপ্রিয় কিন্তু বাস্তব দিকগুলো নিয়ে কথা বলব।
১. জন্ম দেওয়া কি দয়া, নাকি দায়িত্ব?
আমাদের সমাজে প্রায়ই বাবা-মা দের কাছ থেকে শোনা যায়—“আমরা তোকে জন্ম দিয়েছি, লালনপালন করেছি।” এরপর এই কথার উপর ভিত্তি করে সন্তানদের উপর নানা মানসিক চাপ। আমার প্রশ্ন, সন্তান জন্ম দেওয়া কি দয়া, নাকি দায়িত্ব? সন্তান জন্ম দেওয়া বাবা-মায়ের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। মানুষ নিজের ইচ্ছা, ভালো লাগা, জৈবিক আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক চাহিদা থেকেই পরিবার গড়ে। কিন্তু সন্তান পৃথিবীতে আসার জন্য কোনো আবেদন করে না।
তাই সন্তানকে বড় করা কোনো দয়া নয়, বরং নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ব। এই দায়িত্বের দোহাই দিয়ে যদি সন্তানের জীবন নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তবে সেটা আর ভালোবাসা থাকে না—তা হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতার চর্চা।
২. আশ্রয় ও খাবার: ভালোবাসা নাকি নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র?
একটি সন্তানের মৌলিক অধিকার হলো আশ্রয় ও খাবার। এগুলো শর্তহীন হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় দেখা যায়, মতের অমিল হলেই শোনা যায়—“এই বাড়িতে থাকতে পারবি না, কোথায় খাবি গিয়ে খা।”
এই কথাগুলো সন্তানের মনে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। খাবার ও আশ্রয় যখন আনুগত্য আদায়ের অস্ত্র হয়, তখন সম্পর্ক আর সম্পর্ক থাকে না—তা একধরনের মানসিক শোষণে রূপ নেয়। ভয় দেখিয়ে ভালোবাসা টিকিয়ে রাখা যায় না।
৩. সন্তান যখন নিজের ‘এক্সটেনশন’
অনেক বাবা-মা সন্তানকে আলাদা মানুষ হিসেবে না দেখে নিজেদের একটি বর্ধিত অংশ হিসেবে দেখেন। সন্তানের সাফল্যে তাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ে, ব্যর্থতায় তারা লজ্জা পান। এখান থেকেই আসে ‘লোকে কী বলবে’ সংস্কৃতি।
ফলে সন্তান নিজের জীবনের নায়ক না হয়ে বাবা-মায়ের সামাজিক ইগোর বাহন হয়ে ওঠে। তার সিদ্ধান্ত, পছন্দ, এমনকি স্বপ্নও নির্ধারিত হয় সমাজের চোখে বাবা-মায়ের অবস্থান ঠিক রাখার জন্য।
৪. অপূর্ণ স্বপ্নের বোঝা ও Vicarious Living
অনেক সময় বাবা-মা নিজেদের অপূর্ণ ইচ্ছা সন্তানের কাঁধে চাপিয়ে দেন। বাবা যা হতে পারেননি, সন্তানকে তাই হতেই হবে—এই মানসিকতা থেকে জন্ম নেয় ‘Vicarious Living’।
এর ফলে সন্তান নিজের স্বপ্ন আবিষ্কার করার আগেই অন্যের স্বপ্ন বহন করতে থাকে। সুযোগ-সুবিধা দিলেই কারো চিন্তা বা ভালোবাসা কিনে নেওয়া যায় না। সন্তান কোনো ট্রফি নয়, যে তাকে সমাজের সামনে প্রদর্শন করতে হবে।
৫. ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল ও অপরাধবোধ
“তোমাকে বড় করতে গিয়ে আমরা সব ত্যাগ করেছি”—এই বাক্যটি আমাদের সমাজে খুব পরিচিত। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘Guilt Tripping’। সন্তানের মনে অপরাধবোধ ঢুকিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
ফলে সন্তান বড় হয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে গেলেই মানসিক দ্বন্দ্বে পড়ে। সে বুঝতে পারে না কৃতজ্ঞতা কোথায় শেষ, আর দাসত্ব কোথায় শুরু। ভালোবাসা যখন ভয় ও অপরাধবোধের উপর দাঁড়ায়, তখন তা বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
৬. নিরাপত্তাহীনতা ও ‘ইন্সুরেন্স’ মেন্টালিটি
বাংলাদেশে সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার অভাব থাকায় অনেক বাবা-মা সন্তানকে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ বা ইন্সুরেন্স হিসেবে দেখেন। তারা মনে করেন সন্তান স্বাধীন হলে তারা গুরুত্ব হারাবেন।
এই ভয় থেকেই নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা তৈরি হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—স্বাধীন সন্তানই আসলে দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে ওঠে, জোর করে আটকে রাখা মানুষ নয়।
৭. জেনারেশনাল ট্রমা: বিষাক্ত চক্র
আজকের বাবা-মায়েরা নিজেরাও তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে একই আচরণ পেয়ে বড় হয়েছেন। তারা ভালোবাসার ভাষা হিসেবে শাসনই শিখেছেন। তাই অবচেতনভাবে সেটাই তারা সন্তানদের ওপর প্রয়োগ করেন।
এটাই ‘Generational Trauma’। এক প্রজন্মের কষ্ট পরের প্রজন্মে হস্তান্তর হয়। এটাকে আমরা সংস্কৃতি বলে চালাই, অথচ বাস্তবে এটি একটি Toxic Cycle।
৮. সমাধান কোথায়?
ভালোবাসা মানে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং ডানা মেলার সুযোগ দেওয়া। কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত, কিন্তু তা কখনোই ব্যক্তিত্ব বিসর্জনের শর্তে নয়।
একজন প্রকৃত অভিভাবক তিনি, যিনি সন্তানের হাতে নিজের জীবনের রিমোট কন্ট্রোল তুলে দেন, ভয় নয়—বিশ্বাস তৈরি করেন। সন্তান কোনো প্রজেক্ট নয়, কোনো ইনভেস্টমেন্ট নয়—সে একজন পূর্ণ মানুষ।
উপসংহার
জন্ম মানেই আজীবন ঋণ নয়। বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান আসে সম্পর্ক থেকে, জোর থেকে নয়। আমাদের পারিবারিক কাঠামোকে সুস্থ করতে হলে নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।