
দেশের জন্য মানুষ যুদ্ধ করে, প্রাণ দেয়, সারা জীবন সংগ্রাম করে, অনেক ত্যাগ স্বীকার করে। কিন্তু এই যে স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা—অর্থাৎ স্বদেশপ্রেম—এটা কি আকাশ থেকে পড়ে, নাকি যত্ন করে বুনে দিতে হয়? মানুষ জন্মেই দেশপ্রেমিক হয়ে ওঠে না; সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে তার ভেতরে এই বীজ রোপণ করে। জন্মভূমি যখন তার সন্তানদের জন্য মধুর শৈশব, মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারে, তখনই তাদের মনে স্বদেশপ্রেমের জন্ম হয়। যখন মানুষ রাষ্ট্রের কাছ থেকে সম্মান, ন্যায়বিচার ও সুযোগ পায়, তখন দেশ তার কাছে কেবল মানচিত্র নয়—একটি আবেগ, একটি দায়িত্ব ও অস্তিত্বের অংশ হয়ে ওঠে।
১. খেলার মাঠ: দেশপ্রেমের প্রথম পাঠশালা
দেশপ্রেমের বীজ বপন হয় শৈশবে, আর তার প্রধান উর্বর ভূমি হলো খেলার মাঠ। একটি শিশু যখন তার পাড়ার মাঠে ধুলোবালি মেখে খেলে, তখন সে কেবল খেলাধুলা করে না, বরং মাটির সাথে তার প্রথম সখ্যতা তৈরি হয়। মাঠের সেই জয়-পরাজয়, দলগত একতা এবং মাটির ঘ্রাণ তাকে শেখায়—এই ভূমি তার নিজের। সেখানে সে শিখে সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ আর পরস্পরের জন্য লড়াই করা। বন্ধুর সাথে ভাগ করা হাসি-কান্না ধীরে ধীরে তাকে সামাজিক মানুষ করে তোলে। এভাবেই খেলার মাঠে জন্ম নেয় শিকড়ের টান, যা বড় হয়ে রূপ নেয় গভীর স্বদেশপ্রেমে। মাঠের প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি পতন আর উঠে দাঁড়ানো শিশুকে মানসিকভাবে দৃঢ় করে। অজান্তেই সে বুঝে—এই মাটি রক্ষা করাও একদিন তার দায়িত্ব হবে।
২. সাংস্কৃতিক উৎসব: যেখানে ‘আমরা’ সবাই এক
সাংস্কৃতিক উৎসব হলো এমন এক পরিসর, যেখানে মানুষ ব্যক্তি নয়—সমষ্টি হয়ে ওঠে। মেলা, যাত্রাপালা, বৈশাখী উৎসব, গ্রাম্য মেলা বা লোকসংগীতের আসরগুলো একসময় ধর্ম-বর্ণ-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে এক জায়গায় দাঁড় করাত। সেখানে কেউ আলাদা ছিল না, সবাই ছিল “আমরা”। শিশু যখন রঙিন আলো, গান, নাটক আর মানুষের হাসির ভিড়ে বড় হয়, তখন তার মনে দেশের প্রতি স্বাভাবিক টান তৈরি হয়। এই উৎসবগুলো মানুষকে নিজের এলাকার সংস্কৃতি চিনতে শেখায়, শেখায় সহনশীলতা ও সহাবস্থান।
কিন্তু আজ সেই সর্বজনীন উৎসবগুলোর জায়গা দখল করে নিচ্ছে প্রায় একচ্ছত্রভাবে ওয়াজ মাহফিল। এগুলোতে অনেক সময় নারী, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বা ভিন্নমতাবলম্বীরা স্বচ্ছন্দে অংশ নিতে পারে না। উপরন্তু, বহু মাহফিলে মানবিক ও যুক্তিবাদী চর্চার বদলে কুসংস্কার, ভয় আর বিভাজনের ভাষা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে উৎসব আর মিলনের জায়গা না হয়ে সমাজে দূরত্ব বাড়ানোর উপাদান হয়ে উঠছে।
যখন সমাজে মুক্ত ও রঙিন সাংস্কৃতিক মঞ্চ থাকে না, তখন ‘আমরা’ ভেঙে গিয়ে কেবল ‘আমি’ বা ‘আমার গোষ্ঠী’ টিকে থাকে। অথচ প্রকৃত স্বদেশপ্রেম জন্মায় তখনই, যখন মানুষ অনুভব করে—এই দেশ শুধু আমার নয়, আমাদের।
৩. নিরাপদ ভবিষ্যৎ: দেশপ্রেমের মূল ভিত্তি
দেশপ্রেম শুধু আবেগ নয়, এটি নিরাপত্তা ও আশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষ তখনই দেশের জন্য ভাবতে শেখে, যখন সে জানে এই দেশ তার আগামী দিনের দায় নেবে। একটি শিশু যদি দেখে তার পড়াশোনা, স্বাস্থ্য আর কর্মজীবনের জন্য একটি স্থিতিশীল পথ আছে, তবে তার মনে স্বাভাবিকভাবেই দেশের প্রতি আস্থা জন্মায়।
কিন্তু যখন চারদিকে অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব আর বৈষম্য ছড়িয়ে পড়ে, তখন মানুষের মনে জন্ম নেয় ভয় ও হতাশা। যে দেশে তরুণরা ভবিষ্যৎ খুঁজে পায় না, সে দেশে দেশপ্রেম ক্রমে অভিবাসনের স্বপ্নে পরিণত হয়। মানুষ তখন দেশের জন্য মরতে নয়, দেশ ছেড়ে বাঁচতে চায়। নিরাপত্তা মানে শুধু শারীরিক সুরক্ষা নয়, ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সম্মানের নিশ্চয়তাও। রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের এই ভিত্তিগুলো দিতে পারে, তবেই দেশ মানুষের কাছে কেবল ভূমি নয়—একটি ভরসার নাম হয়ে ওঠে।
উপসংহার:
স্বদেশপ্রেম কোনো স্লোগান নয়; এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা এক মানসিক সম্পর্ক। খেলার মাঠ শৈশবে মাটির টান শেখায়, সাংস্কৃতিক উৎসব মানুষকে ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’-তে আনে, আর নিরাপদ ভবিষ্যৎ সেই ভালোবাসাকে স্থায়িত্ব দেয়। এই তিনটি ভিত্তি যদি দৃঢ় হয়, তখন দেশ মানুষের কাছে কেবল একটি ঠিকানা নয়—একটি আবেগ, দায়িত্ব ও ভরসার নাম হয়ে ওঠে।